চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি দাঁড়াতে পারে ৪ শতাংশে। পরবর্তী অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। দুটি পূর্বাভাসই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়ার অনেক দেশের প্রবৃদ্ধি কমে এলেও কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ভুটানের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকবে। এদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে আরো নাজুক অবস্থান যেতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে গতকাল প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) এপ্রিল ২০২৬’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করছে এডিবি। এছাড়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে ভোগ ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় গত প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব ফেলেছিল। তবে তা ধীরে ধীরে কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে প্রায় সব দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে। চলতি বছরে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালদ্বীপে, মাত্র ১ শতাংশ। এছাড়া পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে ব্রুনাই, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, থাইল্যান্ড ও নেপাল।
অন্যদিকে এডিবির হিসাবে, সবচেয়ে বেশি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে কিরগিজস্তানে। তবে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বেশি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ভিয়েতনামে, যা ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া কম্বোডিয়ায় ৪ দশমিক ৫, ভারত ও ভুটানে ৬ দশমিক ৯, ইন্দোনেশিয়ায় ৫ দশমিক ২, মালয়েশিয়ায় ৪ দশমিক ৫ ও শ্রীলংকার ৪ শতাংশ।
এডিবি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রাথমিক স্থিতিশীলতার একটি পরিস্থিতিতে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। জ্বালানি পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি করবে।
চলতি বছর বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি, যা এশিয়ার মধ্যে ৩৮তম অবস্থান। কারণ হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য এবং চলমান সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নকে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি আশা করা হচ্ছে। তখন অর্থনীতিতে বাহ্যিক অভিঘাত কমে আসবে এবং দেশীয় সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হবে।
কয়েক বছর ধরে দেশের উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমুখী রাজস্ব আহরণ, আমদানি-রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতি, শ্রমের মজুরি কমে যাওয়া এবং অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলছে। বিশেষত ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরির্বতনের ফলে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তা আরো বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেও লাভ হয়নি। চলতি অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও গত আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
এডিবির পূর্বাভাসে চলতি হিসাব অনুসারে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে ঘাটতি থাকতে পারে ঋণাত্মক দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ঋণাত্মক দশমিক ৬ শতাংশ হবে। এর পেছনে রয়েছে আমদানি চাহিদা বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ঘাটতির সম্প্রসারণ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা সত্ত্বেও প্রবাসী আয় স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছে এডিবি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, নির্বাচন-সংক্রান্ত সরকারি ব্যয় এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে ভোগ ও বিনিয়োগে মাঝারি প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, শিপিং রুট ও সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং চলমান মূল্যসংকোচন প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে। ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের নমনীয়তা কমে যাবে।
এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর হোয়ে ইউন জিয়ং বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে একটি কঠিন অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বাহ্যিক ও আর্থিক খাতের চাপে প্রভাবিত হচ্ছে।’
তিনি আশা করেন, নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী, বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার ও এ প্রক্রিয়াকে সহায়তার জন্য একটি সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করেছে। সুপরিকল্পিত নীতি ও ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি আবারো সহনশীল হয়ে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে।
এডিবি বলছে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি দাম না বাড়ায় বা ভর্তুকি বাড়ায়, তাহলে বাজেটের চাপ বেড়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়লে রফতানি ও প্রবাসী আয় কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও ফ্রেইট রেট বাড়লে চলতি হিসাব আরো চাপের মধ্যে পড়বে। কারণ এরই মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় তারল্য টানটান অবস্থায় রয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকির ভার স্পষ্টভাবে খারাপ হওয়ার দিকেই আছে। ভালো হওয়ার চেয়ে পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কাই বেশি। এটা দেখায় যে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির বড় ধাক্কা বা সংকটের প্রতি এখনো বেশ সংবেদনশীল। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। এর সঙ্গে আরেকটা বিষয় যোগ করা হয়েছে এডিবির পূর্বাভাসে, তা হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট যেকোনো ধাক্কাও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে আছে।